ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনের ভেতরে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সাড়ে পাঁচ শ চেয়ার, ২০ সেট সোফা, ২২টি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ সবকিছু পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। আগুনের তাপে খসে পড়ছে দেয়ালের পলেস্তারা। কালো ছাইয়ে ঢাকা মিলনায়তনটি এখন ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে, যা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ আগে কখনো দেখেননি।
গত ২৮ মার্চ হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌলভীপাড়ায় এই মিলনায়তনে আগুন ধরিয়ে দেয় সংগঠনের কর্মী–সমর্থকেরা। একই সময়ে তাঁরা আগুন দেন পাশের চারতলা পৌর কমপ্লেক্সেও। সেখানে রাখা আটটি গাড়ি, ছয়টি মোটরসাইকেলসহ ভবনের অধিকাংশ জিনিসই পুড়ে গেছে।
ঘটনার পাঁচ দিন পর গত শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র চারদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পৌরসভার সচিব মো. সামসুদ্দিন পৌর কমপ্লেক্স ভবনের বাইরে একটি টুলে বসে ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ধর ধর বলে ঝড়ের বেগে হামলা চালানো হয়, প্রাণ বাঁচাতে কর্মকর্তা–কর্মচারীরা দিগ্বিদিক পালাতে থাকেন। তিনিসহ ১০-১২ জন অনেকটা তখন জীবন হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। সামসুদ্দিন বলেন, পৌরসভার ১৫৩ বছরের ইতিহাসে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। পুরোনো কাগজপত্র সব পুড়ে গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের চারপাশেই এমন ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনের সহিংসতায় মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল সরকারি স্থাপনা। শহরটিতে অন্তত ৫৮টি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় হামলা হয়। এগুলোর মধ্যে ৩১টি সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। এর বাইরে ১২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তিনটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, একটি মন্দির, তিনটি ব্যক্তিগত ও দলীয় কার্যালয় এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের সাতটি বাড়ি। এগুলোর মধ্যে ২৬টিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এই তিন দিনে সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৫।
সহিংসতার শুরু ২৬ মার্চ বিকেলে। ওই দিন জুমার নামাজের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ধর্মভিত্তিক দলের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও সরকারি দলের কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এর জেরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বিক্ষোভকারী মাদ্রাসাছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে চারজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই খবরের জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাস্তায় নেমে আসেন বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তাঁরা রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও আগুন দেন।
টানা তিন দিনের সহিংসতার শেষ দিন, ২৮ মার্চ মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে শার্ট–প্যান্ট পরা কিছু তরুণ–যুবকও ছিলেন। জেলা পরিষদ কার্যালয় ও আনন্দময়ী কালীমন্দিরের সিসি ক্যামেরার দুটি ফুটেজে এটা দেখা গেছে। মন্দিরের প্রধান ফটক ভেঙে ঢুকেই চারটি সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়। ৩০ সেকেন্ডের ফুটেজে দেখা যায়, হামলায় পায়জামা–পাঞ্জাবি পরা ব্যক্তিদের সঙ্গে শার্ট-প্যান্ট পরা কিশোর, তরুণ, যুবকও ছিলেন। মন্দিরের পুরোহিত জীবন কুমার চক্রবর্তীও একই কথা জানান।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান বলেন, তদন্ত শেষে বিষয়টি খোলাসা হবে।